বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতল মিরাজবাহিনী। বোলারদের দৃঢ়তা আর ব্যাটারদের ধৈর্য পরীক্ষার দিনে মিরপুরে ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।
সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয় তুলে নিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্জন।
বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য ৫ উইকেট হাতে রেখেই টপকে যায় বাংলাদেশ।
২ ওভারে ৩ উইকেট নেই অস্ট্রেলিয়ার, রান তখনো শূন্য!
স্কোরটা দেখে যে কারও চোখ কচলাতে শুরু করার কথা। দলটা আসলেই অস্ট্রেলিয়া আর প্রতিপক্ষে বাংলাদেশ তো?
টসে জিতে ব্যাটিং করতে নেমে তাসকিন ও মোস্তাফিজের তোপে পড়ে শুরুতেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। ইনিংসের তৃতীয় বলেই তাসকিনের ইনসুইং ডেলিভারিতে বোল্ড হন ওপেনার ম্যাথু শর্ট।
পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান জোড়া আঘাত হানেন। তার বলে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে একে একে সাজঘরে ফেরেন কুপার কোলোনি ও ম্যাট রেনশো।
দলীয় স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ করার আগেই ৩টি উইকেট হারিয়ে বসে তারা।
ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রান তোলার আগেই প্রথম ৩টি উইকেট হারানোর লজ্জার রেকর্ডে নাম লেখাল অস্ট্রেলিয়া।
একটা পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় ব্যাপারটা কতটা অভাবনীয়—ওয়ানডে সংস্করণে ১০২৪ ম্যাচ খেলেই এই প্রথম তারা শূন্য রানে ৩ উইকেট হারাল।
মাত্র ২৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে অজিরা।
মোস্তাফিজের অফ স্টাম্পের বাইরের শর্টপিচ ডেলিভারি স্কয়ার কাট করতে গিয়ে শান্তর হাতে ক্যাচ দেন ১৩ রান করা অ্যালেক্স ক্যারি।
এরপর মাত্র ৬ রানের ব্যবধানে ২ উইকেট তুলে নেন তানভীর ইসলাম। ফলে ৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
ধসে পড়া অজি ইনিংসকে টেনে তোলেন মার্নাস লাবুশেন ও জাভিয়ের বার্টলেট। সপ্তম উইকেটে তারা গড়েন শতরানের এক মূল্যবান জুটি।
অবশেষে তাসকিন এই প্রতিরোধ ভাঙেন। ৪৮ বলে ৫২ রান করা বার্টলেটকে বোল্ড করে জুটি ভাঙেন এই পেসার।
এর কিছুক্ষণ পরই মিরপুরের আকাশে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে খেলা বন্ধ হয়ে যায়।
বৃষ্টি নামার আগে ৪২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ১৮৭ রান। লাবুশেন ৫৫ রানে অপরাজিত ছিলেন। বৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস সেখানেই শেষ করতে হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর খেলা পুনরায় শুরু হলে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ৪১ ওভারে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান।
রান তাড়া করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ।
গুড লেন্থে পড়া বলে সোজা ড্রাইভ খেলতে গিয়ে বোলার জাভিয়ের বার্টলেটের হাতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে শান্তকে সঙ্গে নিয়ে দলের হাল ধরেন অভিজ্ঞ সৌম্য সরকার।
এই দুই ব্যাটার মিলে গড়ে তোলেন ৮৬ রানের চমৎকার এক জুটি।
তবে উইকেটে থিতু হয়েও রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে ব্যক্তিগত ৪২ রানে সৌম্য আউট হলে এই জুটিটি ভেঙে যায়।
দলীয় ৮৬ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারানোর পর উইকেটে থিতু হতে পারেননি সহ-অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও। দলীয় ৯৮ রানের মাথায় ব্যক্তিগত ৪২ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি।
তবে আউট হওয়ার আগে ওয়ানডে ক্রিকেটে ২ হাজার রান ছোঁয়ার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেন শান্ত।
দেশের ১১তম ব্যাটার হিসেবে ওয়ানডেতে এই কীর্তি গড়লেন তিনি, যা যৌথভাবে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় দ্রুততম ২ হাজার রানের রেকর্ড।
মিরপুরে লিটনের ওয়ানডে পরিসংখ্যান ভালো নয়।
প্রায় এক যুগের ক্যারিয়ারে করতে পারেননি কোনো ফিফটি। আজও দারুণ খেলতে থাকা ম্যাচে আরও একবার মিরপুরের ঘূর্ণি ও বাউন্সের ধাঁধায় আটকে যান।
ক্যামেরন গ্রিনের এক আচমকা বাউন্সারে গ্লাভসে বল লাগিয়ে উইকেটরক্ষক জশ ইঙ্গলিসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ২১ রানে নেন বিদায়।
ছয়ে নামা মোসাদ্দেকের শুরুটা ছিল বেশ আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী।
অজি স্পিনার অ্যাডাম জাম্পার ওপর চড়াও হয়ে প্রথম বলেই ডাউন দ্য ট্র্যাকে এসে খেলেন এবং তিনটি চমৎকার বাউন্ডারি হাঁকান।
পরে তার বলেই উড়িয়ে মারতে গিয়ে ফিরেন ১৫ রানে। ফলে মাত্র ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে আচমকা কিছুটা ব্যাকফুটে পড়ে যায় বাংলাদেশ।
তবে ভয়কে জয় করেছেন মিরাজ-হৃদয়। ভালো বলকে সমীহ করেছেন, খারাপ বল থেকে করেছেন বাউন্ডারি আদায়।
শেষ পর্যন্ত হৃদয় ৪০ ও মিরাজ ২২ রানে অপরাজিত থেকেই ম্যাচ শেষ করেন।
তাতে ৩৬ বল ও ৫ উইকেট হাতে রেখেই অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একটি করে উইকেট শিকার করেন ক্যামরুন গ্রিন, ম্যাট রেনশো, অ্যাডাম জাম্পা, জেভিয়ার বার্টলেট ও রাইলি মেরেডিথ।


