ঋতুপর্ণাদের ম্যাচ ফি, বেতন, পুরস্কার কিছুই দিচ্ছে না বাফুফে!
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল মাঠে জয়, ট্রফি, করতালি পেলেও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের প্রাপ্য আটকে থাকে ফাইলের নিচে। ঋতুপর্ণাদের ম্যাচ ফি, বেতন, পুরস্কার কিছুই দিচ্ছে না বাফুফে!
মাঠে একের পর এক গৌরবের কাব্য লিখেই চলেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।
দক্ষিণ এশিয়ায় টানা দুবার সেরা। প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে জায়গা করে ইতিহাস গড়েছে।
তবে এমন সোনালি সাফল্যের আড়ালে যে লুকিয়ে আছে তিক্ত বাস্তবতা তার খবর কে রাখে? ম্যাচ ফি, বেতন, পুরস্কার—সব ক্ষেত্রেই চলছে গড়িমসি।
২০২৪ সালের জুনে চায়নিজ তাইপের বিপক্ষে ঢাকায় দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।
জুলাইয়ে ভুটানের থিম্পুতে খেলেছে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচ।
এ বছর মার্চে আরব আমিরাতে দুটি, জুনে জর্ডানে দুটি ও জুলাইয়ে মিয়ানমারে খেলেছে তিনটি ম্যাচ।
সব মিলিয়ে ১১টি ম্যাচের ম্যাচ ফি এখনো পাননি বলে জাতীয় দলের একাধিক খেলোয়াড় অভিযোগ করেছেন।
অথচ টাকার অঙ্কটা খুব বড় নয়।
মেয়েদের জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচে এক মিনিটের জন্যও কেউ মাঠে নামলে পান ১০ হাজার টাকা। ম্যাচ না খেলা খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার টাকা।
‘গত বছর সাফে খেলা ৪ ম্যাচের ফি পেয়েছি ৪০ হাজার টাকা। সাফের আগে তাইপে আর ভুটান, এ বছর জর্ডান ও মিয়ানমারে খেলেছি। আমার মোট ৯ ম্যাচের ফি বাকি। এই টাকার জন্য কতবার বাফুফে ভবনের চতুর্থ তলা থেকে তৃতীয় তলায় নেমে অনুরোধ করেছি, কিন্তু কোনো ফল মেলেনি। ’
মনিকা, ঋতুপর্ণা, সাবিনারা এখন ভুটান লিগে খেলছেন। চুক্তি অনুয়ায়ী এ সময়ে তাঁরা বাফুফে থেকে বেতন পাবেন না।
কোচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা খেলোয়াড়দের বড় একটা অংশের সঙ্গে মে মাসে চুক্তি করে বাফুফে। চুক্তির আগপর্যন্ত কয়েক মাস তাঁরাও ছিলেন বেতনহীন।
ভুটানে খেলতে যাওয়া আরেক শীর্ষ খেলোয়াড় জানান, তাঁরও ৩৫ দিনের বেতন বাকি।
ফেব্রুয়ারিতে একুশে পদক পেয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন দলকে আর্থিক পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা এখনো না পেয়ে এক খেলোয়াড়ের দুঃখ,
‘শুনেছি, সরকার তখন নারী দলকে চার লাখ টাকা দিয়েছে। হিসাব করে দেখেছি, খেলোয়াড়ের জনপ্রতি প্রাপ্য ১২ হাজার টাকা। কিন্তু এত মাস পরও সেই টাকা মেলেনি। টাকার পরিমাণ বড় বিষয় নয়, না দেওয়ার মানসিকতাটাই কষ্টের।’
সাফ শিরোপা জয়ের ৯ মাস পার হলেও বাফুফের ঘোষণা অনুযায়ী দেড় কোটি টাকার পুরস্কার এখনো পাননি মেয়েরা।
শিরোপা জয়ের পর গত ৯ নভেম্বর বাফুফের নতুন কমিটির প্রথম সভায় এ পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। খেলোয়াড়দের প্রশ্ন,
‘টাকাই যখন দেবেন না, তখন ঘোষণার কী প্রয়োজন ছিল?’
সাফ জয়ের পর মেয়েরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিতভাবে নিজেদের সমস্যাগুলো জানিয়েছিলেন, কিন্তু সেসব ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি আছে কি না, তাঁরা জানেন না সেটাও।
এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠা দল মিয়ানমার থেকে ফিরেছে জুলাইয়ে।
রাত তিনটায় হাতিরঝিলে ফুটবলারদের সংবর্ধনা দেওয়া হলেও কোনো অর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
যা নিয়ে ক্ষুব্ধ এক খেলোয়াড়ের মন্তব্য,
‘মঞ্চ বানানো, খেলোয়াড়দের কাটআউট বানানো—এসব না করে বরং মেয়েদেরই টাকাটা দিতে পারত।’
বাংলাদেশে এখনো নিয়মিত হয় না মেয়েদের ফুটবল লিগ।
১২-১৩ জন নারী ফুটবলার লিগ খেলছেন ভুটানে। ভুটানের খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশের মেয়েদের অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,
‘এত ভালো খেলার পরও তোমাদের দেশে কেন লিগ নেই!’
শুনে বাংলাদেশের মেয়েরা লজ্জা পান। এক খেলোয়াড় বলেছেন,
‘ভুটানের মেয়েরা সবই সময়মতো পায়। আর আমরা মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকি।’
ম্যাচ ফি ও পুরস্কারের টাকা নিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণ জানতে চাইলে বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার বল ঠেলে দেন সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেনের কোর্টে,
‘ফাইন্যান্স আমার বিষয় নয়, সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেন।’
সাধারণ সম্পাদকের দাবি,
‘মেয়েদের ১১ ম্যাচে ম্যাচ ফি না পাওয়ার তথ্য সঠিক নয়।’
তাহলে সঠিক কী, জানতে চাইলে তিনি সব দেখে জানাবেন বললেও আর কিছু জানাননি। ৯ মাসেও দেড় কোটি টাকার পুরস্কার না দেওয়া প্রসঙ্গে তাঁর উত্তর, ‘নো কমেন্ট।’
একুশে পদকের অর্থ বরাদ্দ আটকে থাকার বিষয়ে সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যা, মন্ত্রণালয় চেক দিয়েছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের নামে, যা ভাঙানো যায়নি।
মন্ত্রণালয়কে বাফুফে বা মেয়েদের নামে চেক দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এরপরও কেটে গেছে প্রায় ছয় মাস!
বিসিবি ঋতুপর্ণাকে বাড়ি বানিয়ে দেবে বলেছে।
অথচ নারী ফুটবলারদের অভিভাবক যারা, সেই বাফুফেই সময়মতো তাঁদের ন্যূনতম প্রাপ্যটুকু পূরণ করছে না।